হ্যান্সেল আর গ্রেটেল bangla golpo for child 2020

অনেক অনেক দিন আগে এক ছোট্ট ভাই আর বোন থাকত, যাদের নাম ছিল হ্যান্সেল আর গ্রেটেল। তারা তাদের বাবা আর সৎ মায়ের সঙ্গে জঙ্গলের প্রান্তে একটা ছোট্ট কুটিরে থাকত। হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের বাবা ছিলেন একজন কাঠুরে। তিনি জঙ্গলের গাছ কাটতেন। এই কাজ করে ওনার খুব বেশি রোজগার হত না, ফলে পরিবারের তেমন খাবারও জুটত না। হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের সৎ মা বাচ্চাদের একদম পছন্দ করতেন না। তিনি ভাবতেন ওরা বেশি বেশি খেয়ে নেয়, এবং ওদের দেখাশোনা করাটা বড্ড খাটুনির কাজ। একদিন রাতে, তিনি হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের বাবাকে অভিযোগ জানালেন। আমি তোমার বাচ্চাদের নিয়ে অতিষ্ট হয়ে যাচ্ছি। তুমি ওদেরকে নিয়ে যাও আর জঙ্গলে ছেড়ে দিয়ে এসো। আমি এমনটা করতে পারব না। ওরা আমার সন্তান। অবশ্যই তুমি পারবে। আমি দেখিয়ে দেব। কাল সকালে, আমরা ওদের জঙ্গলে নিয়ে যাব আর ওখানে ছেড়ে দিয়ে আসব। হ্যান্সেল তখনও জেগে ছিল। এবং তার সৎ মা যা কিছু বললেন, সে সব শুনল। পরে আরও গভীর রাতে, হ্যান্সেল বাড়ির বাইরে বেরোল। আর কিছু চকচকে সাদা পাথর খুঁজে নিল, যেগুলো অন্ধকারেও চকচক করে। পরের দিন ভোরে, হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের সৎ মা তাদের ডাকলেন। তোমাদের বাবা আর আমি জঙ্গলে কাঠ কাটতে যাচ্ছি। আর তোমরাও আমাদের সঙ্গে যাবে। এই নাও একটা পাউরুটি দিলাম, তোমাদের খিদে পেলে খাবে। তারা যখন জঙ্গল দিয়ে হাঁটতে শুরু করল, হ্যান্সেল গোপনে পাথর গুলো ফেলতে ফেলতে গেল যাতে পথটা চিহ্নিত হয়। যখন তারা একেবারে জঙ্গলের গভীরে এল, বাচ্চাদের বাবা আর সৎ মা কাঠ কাটার জন্য আলাদা হয়ে গেলেন। আমরা কাঠ কাটতে যাচ্ছি। আমরা না ফেরা পর্যন্ত তোমরা এখানেই থাকবে। হ্যাঁ, মা। বাচ্চা দুটো একা একাই জঙ্গলে সারা দিন কাটাল। অন্ধকার নেমে এল, কিন্তু হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের বাবা আর সৎ মা ফিরে এলেন না। হ্যান্সেল, আমার সত্যিই এবার ভয় ভয় করছে। মা আর বাবা আমাদের কখন এসে আমাদের বাড়ি নিয়ে যাবে? আমার মনে হয় না ওরা আর ফিরে আসবে, গ্রেটেল। তবে তোর চিন্তা করার কিছু নেই। আমি ঠিক বাড়ি নিয়ে যাব। হ্যান্সেল যে পাথর গুলো মাটিতে ফেলেছিল, সেগুলো অন্ধকারেও চকচক করছিল। তাই তারা সেগুলো অনুসরণ করে হাঁটতে শুরু করল আর খুব সহজেই বাড়ি ফিরে এল। তাদের বাবা তো তাদের দেখে অবাক হয়ে গেলেন। হ্যান্সেল, ওহ গ্রেটেল। ভেবে ভাল লাগছে তোমরা সুরক্ষিত আছো। আমি ভীষণই দুঃখিত। আমি কখনই তোমাদের একা ছেড়ে দেব না। কয়েক দিন পর, হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের বাবা তার কুঠারটা মেরামত করতে শহরে গেলেন। এবং হ্যান্সেল আর গ্রেটেলকে একা বাড়িতে তাদের সৎ মায়ের কাছে রেখে গেলেন। হুম! এখন ওদের বাবা কাছাকাছি নেই। ওই হতচ্ছাড়া গুলো থেকে মুক্তি পাওয়ার এটাই সবথেকে ভাল সময়। ওই কুচুটে সৎ মা বাচ্চাদের বাড়ির বাইরে যাওয়ার কথা বললেন। আরে চলো চলো. আমরা সবাই জঙ্গলে একটা পিকনিক করতে যাব। পিকনিক? এখন? হ্যান্সেল তার সৎ মাকে বিশ্বাস করত না। সে গোপনে একটা পাউরুটি চুরি করে লুকিয়ে রেখে দিল। তারা যখন জঙ্গলে যাচ্ছিল, হ্যান্সেল পাউরুটির টুকরোগুলো মাটিতে ফেলতে ফেলতে লাগল। তারা যখন গভীর জঙ্গলে পৌছে গেল, তাদের সৎ মা তাদের দিকে কড়া চোখে তাকিয়ে বলল দুজনে এখানেই দাঁড়াও। আমি একটু পরে ফিরে আসছি। বাচ্চারা অপেক্ষা করল। কিন্তু তাদের সৎ মা ফিরে এলেন না। অন্ধকার নেমে এল এবং গ্রেটেল আবারও খুব ভয় পেতে শুরু করল। হ্যান্সেল। বাড়ি ফিরে চলো। আমার ভয় লাগছে। আমাদের সকাল না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে, গ্রেটেল। আমি রাস্তায় পাউরুটির টুকরো ফেলে এসেছি, কিন্তু সকালের আলো না ফোটা পর্যন্ত আমরা ওগুলো দেখতে পাব না। যখন সূর্য উঠল, হ্যান্সেল আর গ্রেটেল পাউরুটির টুকরোগুলো খুঁজতে লাগল, কিন্তু তারা কোথাও সেগুলো দেখতে পেল না। এ বাবা! পাখি আর ইঁদুরে নিশ্চয়ই পাউরুটিগুলো খেয়ে নিয়েছে। এবার আমরা কি করে বাড়ি ফিরব? হ্যান্সেল আর গ্রেটেল জঙ্গলের মধ্যে হাঁটতে লাগল। আশা করল এমন কাউকে খুঁজে পাবে যে তাদের সাহায্য করবে। বেশ কিছুক্ষন পর, হ্যান্সেল আর গ্রেটেল একটা চমৎকার বাড়ি দেখতে পেল। আর সেটা ছিল জিঞ্জার ব্রেড, চকলেট গামড্রপ আর নানান মিষ্টি দিয়ে সাজানো। ওই বাড়িটার দিকে দেখো, হ্যান্সেল। এটা আমাদের প্রিয় মিষ্টি গুলো দিয়ে তৈরি। মম! এটা খুবই সুন্দর দেখতে লাগছে! ছোট বাচ্চা দুটোর এতটাই খিদে পেয়েছিল, যে তারা বাড়িটার বড় টুকরো গুলো ভেঙ্গে নিল আর সেগুলোই খেতে শুরু করল। একজন বুড়ি বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এলেন। তিনি হ্যান্সেল আর গ্রেটেলকে দেখে হাসতে শুরু করলেন। ছোট্ট বাচ্চারা। তোমাদের নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে। চলে এসো। আমি তোমাদের গরম দুধ খেতে দেব। হ্যান্সেল আর গ্রেটেল বুড়িটার বাড়ির ভিতরে গেল। সেখানে তিনি তাদের পেট ভর্তি করে খেতে দিলেন। তোমরা যতটা পারো খেয়ে নাও, বাচ্চারা। লজ্জা পেয়ো না। এখানে অনেক আছে। যখন হ্যান্সেল আর গ্রেটেলের খাওয়া শেষ হল, তারা বুড়িটাকে বলল যে এবার তাদের বাড়ি যেতে হবে। আমাদের খাওয়ানোর জন্য ধন্যবাদ। আপনি আমাদের বলতে পারবেন আমরা কিভাবে বাড়ি যাব? বুড়িটা হাসতে লাগল। বাড়ি? কখনও না। তোমরা দুজন এখানেই থাকবে। যাতে আমি তোমাদের খেতে পারি। হু? বেচারা হ্যান্সেল আর গ্রেটেল! বুড়িটা তাদের বন্দি করে ফেলল। তখনই বাচ্চারা বুঝতে পারল যে এই বুড়িটা আসলে একটা বাচ্চা খেকো ডাইনি, যে তাদের বন্দি করার জন্য মিষ্টি দিয়ে বাড়ি তৈরি করে রেখেছে। ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ডাইনিটা হ্যান্সেলকে একটা খাঁচায় বন্দি করে ফেলল। তুই এখানে থাকবি, খোকা। যতক্ষণ না তুই হৃষ্টপুষ্ট হচ্ছিস। ডাইনিটা তখন গ্রেটেলের কাছে এল। তুই এখন আমার জন্য কাজ করবি। সে গ্রেটেলকে দিয়ে রান্না করা, পরিষ্কার করা, ধোয়া আর মোছার কাজ করাতে লাগল। সকাল হলেই ডাইনিটা প্রতিদিন এসে দেখত, হ্যান্সেল খাওয়ার মত গোলগাল হয়েছে কিনা। তোর আঙুলগুলো দেখা দেখি, হ্যান্সেল। দেখি তো কতটা মোটা হলি তুই। ডাইনিটা ভাল দেখতে পায় না জেনে, হ্যান্সেল ছলচাতুরি করে একটা মুরগির হাড় তার দিকে বাড়িয়ে দিল। আহ। তুই এখনও রোগা পাতলাই আছিস। একদিন সকালে ডাইনিটার খুব খিদে পেয়েছে। সে রেগে মেগে গ্রেটেলকে ডাকল। গ্রেটেল, আজ জল খাবারে আমি হ্যান্সেলকে খেতে চাই। ওই বড় পাত্রটা গরম জল দিয়ে ভর্তি কর। আমি একটা সুন্দর হ্যান্সেল স্যুপ বানাব। বেচারা গ্রেটেল। সে কি করবে ভেবেই পেল না। সে শুধু জানত তাকে হ্যান্সেলকে বাঁচাতে হবে আর তাই জল গরম করার ফাঁকে একটা উপায় ভাবতে লাগল। কিছুক্ষন পর, ডাইনিটা দেখতে এল, পাত্রের জল গরম হয়েছে কিনা। জলটা এখনও ফুটছে? আমি খাওয়ার জন্য প্রস্তুত। উহ, ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি পাত্রের ভিতরে দেখতে পাচ্ছি না। এটা আমার পক্ষে খুবই বড়। ডাইনিটা হ্যান্সেলকে খাওয়ার জন্য এতটাই উদগ্রীব ছিল যে সে স্টোভের ওপর উঠে পড়ল, আর পাত্রের ভিতর উকি মারল। ছোট্ট গ্রেটেল তখন বুদ্ধি করে ডাইনিটাকে নিজের সমস্ত শক্তি দিয়ে পাত্রের মধ্যে ঠেলে দিল। ডাইনিটা গরম জলের মধ্যে পড়ে গেল আর তখনই গ্রেটেল ঢাকনা দিয়ে দিল। সে তখন খাঁচাটা খুলে হ্যান্সেলকে মুক্ত করে দিল। ডাইনিটা মরে গেছে, হ্যান্সেল। এবার আমরা বাড়ি যেতে পারব। কি মজা! শুধু ডাইনিটা মরেই গেল না, সেই সঙ্গে হ্যান্সেল আর গ্রেটেল ডাইনির বাড়িতে সোনার মুদ্রা ভর্তি একটা পাত্র খুঁজে পেল। আচ্ছা আমরা এটা দিয়ে অনেক খাবার কিনতে পারব। বেশ দীর্ঘক্ষন হাঁটার পর, হ্যান্সেল আর গ্রেটেল অবশেষে জঙ্গল থেকে বেরোনোর পথ খুঁজে পেল। তারা বাড়ি পৌছে দেখল, তাদের বাবা তাদের জন্য অপেক্ষা করছেন। বাচ্চারা! আমি খুব খুশি হয়েছি তোমাদের দেখে। খুব ভাল লাগছে তোমরা ফিরে এসেছো। আমি তোমাদের সৎ মাকে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছি। তিনি আর আমাদের বিরক্ত করতে পারবেন না। হ্যান্সেল আর গ্রেটাল তাদের বাবাকে সেই খুঁজে পাওয়া সোনার মুদ্রা গুলো দেখাল। তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তাদের তিন জনের আর কখনওই টাকার অভাব হল না এবং তারপর থেকে তারা সুখেই থাকতে লাগল। 

Leave a Reply

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।